নীলাম্বরী রহস্য

youramdad


নীলাম্বরী রহস্য
১।
আজগর সাহেবের বাড়ির সামনে আজ প্রচুর ভিড়। সকাল থেকেই মূলত খুব ভিড়। সকাল থেকে পুলিশও আছে প্রচুর। আজ আজগর সাহেবের জন্মদিন। বাংলাদেশের খুব বিখ্যাত ডিরেক্টর তিনি। নিজ হাতে আসাদ, জাফর, শোয়েবের মত বিখ্যাত নায়কদের তৈরি করেছেন। সাধারণভাবেই এই দিনে ভক্তরা খুব ভিড় করে তার বাড়ির সামনে। বাংলা সিনেমার নতুন ভিত বলতে গেলে এই আজগর সাহেব, তপন আহমেদ সাহেব, নিখিলেশ দাদা, প্রদোষ বাবু এদের হাত ধরেই। সিনেমাপাগল মানুষও এদের খুব ভক্তি করে। আজগর সাহেবের জন্মদিনে বাড়ির সামনের এই ভিড় স্বাভাবিক হয়েও স্বাভাবিক না। কারণ কাল রাতে তিনি খুন হয়েছেন। তার লাশ পাওয়া গেছে তার স্টাডি রুমে। বিভৎস লাশটা ক্রুশবিদ্ধ করা। সকাল থেকে পুলিশ এসে লোকজনের ভিড় সামলাচ্ছে। 
ভেতরে বিরক্ত মুখে সিগারেট টানছে রেহান, সিনিয়র ইনভেস্টিগেশন অফিসার। ইন্সপেক্টর রাহাত এসে জিজ্ঞেস করল, "স্যার, ডেডবডি থেকে ক্লু সব নেয়া শেষ। লাশটা কি তাহলে মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করব?"
রেহানের মুখে বিরক্তির ছাপ আরো বাড়ল। সিগারেটে আরেকটা টান দিয়ে বলল, বাজেট টা এবার পছন্দ হয়নি। আগে তো মানুষজন বেনসন এন্ড হেজেস গিফট করত। কপাল থেকে মনে হয় এটাও যাবে। 
রাহাত অবাক হয়ে বলল, কেন স্যার?
আর বোলো না। ১১ টাকা পিস, কেউকি এত দাম দিয়ে গিফট করবে? ঘুষ না খাই। কিন্তু সিগারেট গিফট না পেলে কিভাবে? যাই হোক এখন বলো কি কি পাওয়া গেল? - জিজ্ঞেস করল রেহান।
রাহাত বলল, তেমন কিছু না স্যার। খুনি প্রোফেশনাল। কোন ক্লু ছেড়ে যায় নি। তবে সন্দেহজনক দুইটা জিনিস পাওয়া গেছে। এক টুকরো কাগজ। কবিতার মত কি যেন লেখা। আর একটা ছবির ক্যাসেট। আজগর সাহেবেরই নীলাম্বরী ছবির।
রেহান ঝট করে মুখ তুলে তাকাল। বলল, ছবিটা কবে রিলিজ হয়েছিল জানো? ৫ বছর আগে আজগর সাহেবের জন্মদিনে। কাগজ টা দেখি?
রাহাত কাগজ টা এগিয়ে দিল। কাগজে চার লাইনের কবিতা লেখা। শেষ লাইন টা কেমন যেন।
"আজকে হবে বৃষ্টি,
তপবনে চল যাই,
নিখিল ভুবন বেড়াব চষিয়া,
সান্ধ্য আনন্দে জাগিয়া ক্রুশবিদ্ধ করে"
আগামাথা কিছুই বুঝল না রেহান।
খুনির ভালো জ্ঞান আছে সাহিত্যের ব্যাপারে। যাক সাধারণ মুর্খ খুনিটুনি না এটুক নিশ্চিত। এই খুনি বেশ শিক্ষিত বোঝা যায়। অন্তত সাহিত্যের দিকে।
২।
আসাদ দরদর করে ঘামছে। একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে ইলেক্ট্রিসিটি নেই বেশ কয়েক ঘন্টা। আইপিএস এর চার্জও শেষ। নিখিলেশ বাবু বসা সামনে। ভদ্রলোকের হাতে সিগারেট। পুরো রুমে তামাকের ঝাঁঝাল গন্ধ। দুজন কাঠের একটা টেবিলের দুই প্রান্তে বসা। মাঝখানে মোমের আলোতে পরিবেশটা ভৌতিক লাগছে। নিরবতা ভাঙল আসাদ।
স্যার, এই ছবিটায় আমাকে নিলেও পারতেন। আমি আজ যা কিছু সব আপনাদের জন্যই। তাছাড়া এরকম চরিত্রে আমি আগেও অভিনয় করে এসেছি।
নিখিলেশ বলল, দেখ আসাদ। দর্শক আগের মত এখন আর তোমার ছবির দিকে ঝুঁকছে না। তোমার দিন শেষ বলতে পার। সবারই একটা বিদায়ের সময় আছে। তাই বলে এমন উতলা হলে তো চলবে না। দেখো অন্য কোনো প্রোডাকশন তোমাকে চায় কি না। নিজেও কিছু চেষ্টা করে দেখতে পার।
আসাদ বলল, কিন্তু স্যার অন্য সব ছবি তো কমন স্টোরি। একই কাহিনী। কোনো ভেরিয়েশন নেই।
তাতে তো আর আমি কিছু করতে পারি না। আজ বৃষ্টি হবে মনে হয়। রাতে থেকে যাও। সকালে ড্রাইভার কে বলে দিব ও তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে। নিখিলেশ বলল।
আসাদ হেসে বলল, আর বাড়ি স্যার! টাকাপয়সা কিছু নেই হাতে। আগামী মাসে বাড়িও ছাড়তে হবে। বেশকয়েকদিন যাবত অসুস্থ, চিকিৎসা করারও টাকা নেই।
আজগর থাকলে হয়ত একটা ব্যবস্থা হত। তিন মাস হল তার মার্ডার হয়েছে। এখনো কেসের কোন অগ্রগতি নেই। সবাই একটা ভীতির মধ্যে আছে। বুঝলে আসাদ?
রুমে আবার নিরবতা নেমে আসল। আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে নিখিলেশ উঠে গেল। আসাদ বসে রইল চুপচাপ। বিখ্যাত নায়ক একসময়ের। কিন্তু এখন নতুন দের ভিড়ে তার দিন প্রায় শেষ বলতে গেলে। কেউই তাকে নিতে চায় না। কিন্তু সে একথা বিশ্বাস করে না। তার বিশ্বাস এখনো দর্শক তাকে আগের মতই চায়।
চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে আসাদ উঠে গেল। বাইরে ঘন মেঘ। রাতও হয়েছে। বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে। আসাদ বের হয়ে হাঁটতে শুরু করল।
ভোর চারটায় নিখিলেশ বাবুর ঘুম ভেঙে গেল টেলিফোনের শব্দে। তপন সাহেবের খুন হয়েছে। সেই একই কায়দায়।
৩।
পরদিন সকালে কাজের লোক এসে প্রথম লাশটা দেখতে পায়।
ঘটনাস্থলে সকালেই ইনভেস্টিগেশন টিম এসে হাজির। ইনভেস্টিগেশন শেষে চিন্তিত মুখে রেহান সাহেব সেই কাগজটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই একই কবিতা, যেটা আজগর সাহেবের লাশের পাশে ছিল। নীলাম্বরী ছবির সিডিটাও আছে।
কিছু তথ্য খুঁজে রেহান দেখতে পেল এটা ৫ বছর আগে আজগর সাহেবের হিট ছবি ছিল। এই ছবির বিশেষত্ব হচ্ছে দেশের বিখ্যাত চার ডিরেক্টর ই এই ছবির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, যার দুজন অলরেডি ডেড। কিন্তু কে করবে এইই কাজ?
কোন কূলকিনারা পাচ্ছে না রেহান। এদিকে মিডিয়াও বেশ লাফালাফি করছে এই ঘটনা নিয়ে। হেডকোয়ার্টার খুব আস্থা নিয়ে তাকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে। এবার চাপও আসছে। কিন্তু খুনি ক্লু দিয়ে না গেলে কার কি করার এই কথাটা কেউ ভাবছে না। রেহান খুব চিন্তিত। চাকরিটা না হারায় এবার
সপ্তাহ যেতে না যেতেই তৃতীয় খুনও হয়ে গেছে আজ। সেই একই কায়দায়। এবার খুন হলেন নিখিলেশ। হেড কোয়ার্টার থেকে ডাক পড়ল রেহানের। কমিশনার সাহেব বেশ কড়া কথা শুনিয়ে রেহানকে বললেন, এই কেস থেকে তোমার সরে যাওয়া উচিৎ বলে পুলিশ ডিপার্টমেন্ট মনে করছে। তোমার কিছু বলার থাকলে বলতে পার। 
রেহান চুপ করে রইল। কি ই বা থাকতে পারে বলার। কিছুক্ষণ পর রেহান বলল, স্যার আরেকবার ভেবে দেখলে হত না? 
কমিশনার সাহেব বললেন, হ্যাঁ, তুমি কেস থেকে দূরে থাকলেও কাজে সাহায্য করতে পার। তবে কেসটা তোমার হাতে থাকবে না। অফিসার রাহাত দেখবে এটা। তুমি চাইলে ওকে সাহায্য করতে পার।
একথা শুনে রেহান উঠে গেল। রাহাতও তার পাশেই ছিল। রাহাতও উঠে যেতে যেতে বলল, স্যার আপনি থাকলে আমারও সুবিধে। কমিশনার স্যার যাই বলুক, কেসটা একসাথেই দেখব আমরা।
৪।
সেদিন রাতে রেহান বাসায় গিয়ে বিষয়টা নিয়ে খুব চিন্তাভাবনা করে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে গেল। এই নীলাম্বরী ছবি নিয়ে খুব হইচই ছিল। আসাদ সাহেব ছিল তখন সেরা নায়ক। কিন্তু সেটে তাকে প্রচুর অপমান করেন ডিরেক্টর। সেই রাগে সে শেষদিকে ছবিটি ছেড়ে দেন। পরে স্ক্রিপ্ট চেঞ্জ করে শেষে ছবিটা রিলিজ হয়েছিল। ছবিটাও হয়েছিল সুপারহিট। কিন্তু বেচারা আসাদ আর মিডিয়ায় দাঁড়াতে পারেনি। যতখানি জানা ছিল ছবির নায়িকার সাথে এফেয়ার নিয়ে ডিরেক্টরের আপত্তি ছিল। সেই ঘটনাতেই তাকে সেটে অপমান করে ডিরেক্টর। তাছাড়া তপন সাহেবের বাসায় রেহান একটা রেকর্ডার দেখেছিল, কিন্তু তা ভুলে চেক করা হয়নি। নিজের চুল ছিঁড়তে মন চাইছে এখন। রেহান রাহাতকে ফোন দিয়ে বলল তাড়াতাড়ি তপন সাহেবের খুনের জায়গায় যেতে।
রাত ১০ টায় তারা দুজন তপন সাহেবের ড্রয়িং রুমে গিয়ে সেই রেকর্ডার পেয়ে গেল। যা ভেবেছিল, রেকর্ডার টা অটোমেটিক চালু হয়। যখন রুমে কোন শব্দ হয় তখনই চালু হয়ে যায়। প্লে বাটনে ক্লিক করে রেহান তাই শুনতে পেল যা ও ভাবছিল। স্টপ করে সে ওই কাগজ টা বের করল। এই কবিতা একটা সাংকেতিক কবিতা। প্রতিটি লাইনের প্রথম শব্দ একেকজন এর নাম। আজকে = আজগর, তপবন=তপন, নিখিল=নিখিলেশ, সান্ধ্য=প্রদোষ। অনেকেই হয়ত বুঝবে না প্রদোষ মানে সন্ধ্যা। এই সিরিয়ালটা জন্মদিনের হিসেবে করা। তাছাড়াও শেষ ছবি করার সময় ডিরেক্টর ছিলেন আজগর সাহেব। নীলাম্বরী ছবির সেই সেটে তার সাথে বাকি তিনজনও ছিল।
আজকে হবে বৃষ্টি,
তপবনে চল যাই,
নিখিল ভুবন বেড়াব চষিয়া,
সান্ধ্য আনন্দে জাগিয়া, ক্রুশবিদ্ধ করে
আজগর, তপন আর নিখিলেশ তো শেষ। কিন্তু সান্ধ্য তো জারো নাম হয় না। তবে? হঠাৎ রেহানের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। সান্ধ্য, সন্ধ্যা। সন্ধ্যার আরেক নাম প্রদোষ। আজ ১২ টায় তার জন্মদিন। সবার খুনই জন্মদিনে হয়েছে। তারমানে!!!! ঘড়িতে তাকিয়ে রেহান দেখল ১১:৪৭। আর ১৩ মিনিট খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে।
এদিকে অফিসার রাহাত কিছুই বুঝতে পারছে না। রেহান তাকে বলল প্রদোষ বাবুর বাসায় যেতে হবে খুব তাড়াতাড়ি। সময় নেই। চলো।
রাহাত বলল, কিন্তু স্যার রেকর্ডার, কাগজ বের করে আপনি কি করলেন কিছুই তো মাথায় ধরছে না।
রেহান বলল, ধরতে হবে না। তাড়াতাড়ি গাড়ি চালাও
প্রদোষ বাবুর বাড়ির দরজায় এসে রেহান দেখল ১২:৩০ বেজে গেছে। ইসসস, হয়ত দেরি করে ফেলেছে। দৌড়ে দোতলায় তার ঘরে ঢুকে দেখে যা ভেবেছিল তাই, প্রদোষ বাবুর ক্রুশবিদ্ধ দেহ সামনে। বাথরুম থেকে পানির শব্দ আসছে। রেহান একটা সিগারেট ধরিয়ে দাঁড়াল। বলল, আসাদ সাহেব, হাত ধোয়া হয়নি? 
বাথরুম থেকে আসাদ বেরিয়ে এল। হাসিমুখে বলল, ধরতে পেরেছেন তাহলে?
রেহান বলল, একাজ কেন করলেন? চারজন খুন কেন করলেন? জানেন আপনার ফাঁসি হবে?
আসাদ বলল, যেখানে আমার ক্যারিয়ার শেষ করে দিয়েছে এরা, সেখানে ফাঁসি হলেই কি! আর আমাকে যেহেতু ধরতে পেরেছেন অফিসার, কেন খুন করেছি তাও হয়ত জানেন।
আসাদকে এরেস্ট করে নিয়ে যাওয়া হল। হেড কোয়ার্টারকে জানানো হল। পুলিশের সব হর্তাকর্তা এসে হাজির। কাল সকালে আদালতে তোলা হবে। রেহান লোহার শিকের দিকে এগিয়ে গিয়ে আসাদকে বলল, শুনেছেন? কাল আদালতে তোলা হবে আপনাকে।
আসাদ বলল, তার আর দরকার হবে না। আমার বুকে হাত দিয়ে দেখুন।
রেহান হাত দিয়ে দেখল ধমনী অস্বাভাবিক লাফাচ্ছে।
আসাদ বলল, ধমনী তে সমস্যা আমার। টাকার অভাবে শুরুর দিকে চিকিৎসা করতে পারিনি। যখন ধরতে পারলাম তখন আর চিকিৎসা নেই। তাই শেষ ইচ্ছা হিসেবে আমাকে ধ্বংস করেছে যারা তাদের ধ্বংস করে দিলাম।
রাহাত চুপ করে বেরিয়ে পড়ল। একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে ভাবল, মিডিয়া, কত মানুষ এর পেছনে দৌড়ায়, আর এর মানুষ কেমন। যেই আসাদ সাহেবকে ডিরেক্টর রা নিজ হাতে গড়ল। তাকেই লাথি মারতে দ্বিধা করল না।
৫।
রাহাত বলল, স্যার সেদিন রেকর্ডার থেকে আপনি কিভাবে বুঝলেন খুনি আসাদ সাহেব? 
রেহান বলল, রেকর্ডার টা প্লে করো।
প্লে করা হল।
প্রথমে কলিং বেলের শব্দ। এরপর কিছু কথোপকথন।
তপন- তারপর আসাদ, কি খবর তোমার?
আসাদ- এইতো, যেরকম আপনারা চেয়েছেন।
তপন- নিখিলেশ আমাকে বলেছিল তোমার কথা। বোঝই তো, এখন দর্শক অন্য কাজ চায়। রিয়েলিস্টিক ছবি যেমন করো তুমি, তা ত আর এখন চলে না। মিডিয়াও তোমাকে সেরকম আর আগের মত কাভার করছে না।
আসাদ- সময় হলে ঠিকই করবে।
তপন- বুঝলাম না ঠিক।
আসাদ- বুঝতে আপনাকে হবেও না। শুভ জন্মদিন স্যার।
এরপর আবার ধস্তাধস্তির শব্দ।
রেহান এবার রাহাতকে বলল বুঝতে পেরেছ?পুলিশের চাকরি তো বেশ কিছুদিন ধরেই করছো, এবার মাথাটাও খাটাও।
গম্ভীর মুখে রাহাত হ্যাঁ সূচক শব্দ করল।
সেরাতে আসাদ সাহেব ধমনি ফেটে মারা যায়। কেসটাও ক্লোজ হয়ে যায়। তাকে আদালতে তোলা হয়নি আর।
ইদানীং আবার অফিসার রেহানের বিরক্ত মুখ দেখতে পাওয়া যায় থানায়। ধুর এইটা কোন বাজেট হল? বেনসন আর হেজেস ১১ টাকা!

সমাপ্ত

About the author

Amdad
I am a simple person, I love to learn new things. I try to take something from every experience in life.

Post a Comment