এক পশলা বৃষ্টি


#এক_পশলা_বৃষ্টি 
#মিম

-দ্যাখ বিষ্টি কি সুন্দর পোলাটা!
- কই দেখোছ?

একরাশ উৎসাহ নিয়ে সুদর্শন পুরুষটিকে এদিক সেদিকে খুঁজছে বৃষ্টি। তার মাথায় আলতো ধাক্কা দিয়ে নুপুর বললো,
- আরে মাতারী তোর সামনেই তো। লাল শাটয়ালা হুন্ডার উপ্রে বইসা আছে৷ দেখোস না!
- হো হো, দেখছি।
- জট্টিল না?
- এক্কেরে।

ফুটপাতে বসে ওরা দুজন বাটারবন খাচ্ছিলো৷  হঠাৎই কিছু একটা ভেবে বৃষ্টি বাটারবন ফেলে পাশে থাকা একগুচ্ছ গোলাপ নিয়ে ছুটলো জ্যামের দিকে। উদ্দেশ্য হচ্ছে লাল শার্টওয়ালার সাথে ফুল বিক্রির বাহানায় একটু কথা বলা। ঝড়ের গতিতে সুদর্শনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো বৃষ্টি৷ গোলাপের গুচ্ছ ছেলেটার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
- ফুল নিবেন?

পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করতে করতে সুদর্শন বললো,
- কত করে?
- ১৫ টাকা।

মানিব্যাগ থেকে একটা দশ টাকার নোট আরেকটা পাঁচ টাকার কয়েন বের করে বৃষ্টির হাতে দিয়ে লাল গোলাপটা নিজের বুক পকেটে রাখলো সুদর্শন। টাকাটা বুঝিয়ে দিতেই জ্যাম ছেড়ে গেল। সুদর্শনও বাইক স্টার্ট দিয়ে চলে গেল। কাছ থেকে দাঁড়িয়ে সুদর্শনকে দেখছিলো বৃষ্টি। মুগ্ধতা ভরে যাচ্ছিলো পুরোটা মন জুড়ে৷ আচমকা জ্যাম ছেড়ে দেয়াই মুগ্ধতায় ব্যাঘাত ঘটেছে তার৷ এ নিয়ে মনে মনে কিঞ্চিৎ বিরক্ত সে৷ গন্তব্যে ছুটতে থাকা ব্যস্ত গাড়ীগুলোর ভীড় থেকে খুব দ্রুত দৌঁড়ে রাস্তা পার হয়ে ফুটপাতে উঠে আসলো সে। ঠোঁটজুড়ে তার প্রশস্ত হাসি। বাটারবন খাওয়া শেষ নুপুরের। ফুটপাতে বসে বৃষ্টিকেই দেখছিলো সে। বৃষ্টি ফিরে আসতেই জিজ্ঞেস করলো,
- কাছ থেইকা দেখতে কেমন রে?
- পুরা নায়ক। খোঁচাইন্না দাঁড়িতে মাইনষেরে এত সুন্দর লাগে!
- তুই তো নায়কের দিকে ভ্যাবলার মত তাকায়া আছিলি৷ নায়ক তো তোর দিকে ফিরাও তাকাইলো না। মনে হয় নায়কের নায়িকা আছে। ফুলটা তার লাইগাই নিছে।

মুহূর্তেই চেহারায় বিষন্নতা ছেয়ে গেলো বৃষ্টির। এমন সুদর্শন নায়কের নায়িকা হতে পারাটা সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। এতটা সৌভাগ্যবান সে না। জন্মসূত্রেই দুর্ভাগ্য নিয়ে এসেছে সে। এই দূভার্গ্য কখনো কাটবে কিনা তাও জানা নেই বৃষ্টির।  

ঘরের মেঝেতে পাতিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। নাসিমা খাটের এককোনায় বসে কাঁদছে আর বিলাপ করছে। সুমন মায়ের পাশে আসন পেতে বসে আছে। মনি খাটে শুয়ে মুখে বালিশ গুঁজে আছে। ঘরে এসেই এই দৃশ্য দেখতে পেলো বৃষ্টি৷ এই দৃশ্য আজ নতুন না। বহু পুরানো৷ জন্মের পর থেকে এমনটাই দেখে আসছে সে৷ জুয়ার টাকা নিয়ে বাবার বাড়াবাড়ি সবসময়ই চলে। বাড়াবাড়ি কখনো কখনো মারামারি পর্যন্ত চলে যায়। মা আজও মার খেয়েছে কিনা তা জানে না বৃষ্টি৷ জানতে ইচ্ছেও হচ্ছে না। শরীর বেশ ক্লান্ত লাগছে। ক্ষুধা নামক ঝড় বয়ে যাচ্ছে পেটে৷ এই মুহূর্তে কিছু খাওয়া অতি জরুরী। আধভাঙা মিটসেফটা সে খুললো খাবারের আশায়। কিন্তু কিছুই নেই সেখানে৷ তীব্র রাগ আর বিরক্তি নিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলো,
- খাওন কই মা?
- মাগী আমি মরি কষ্টে আর তুই আছোস খাওনের তালে?
- আমার খিদা লাগছে তো আমি খাওন চামু না?
- তুই একটা পাষন্ড। মার কষ্ট বুঝোস না লো মাগী, মার কষ্ট বুঝোস না। জাহান্নামে জ্বলবি তুই। তোর বাপও জ্বলবো৷ এই নাসিমার অন্তরের হাঁক তোগো লাগবোই। 
- তুমি পারবা খালি হাঁকই দিতে৷ তোমার মুখ থেইকা ভালো কথা আইবোও না, আমার দুর্ভাগ্য যাইবোও না। 

রাগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় একটু থমকে দাঁড়ালো বৃষ্টি। ছোট ভাইবোনদের জিজ্ঞেস করলো,
-  আমি রুটি ডিম খাইতে যাইতাছি৷ যাবি কেউ?

সুমন তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালো। বোনের কাছে এসে বললো,
- আমি যামু।
- মনি যাইবি না?

বালিশের আড়াল থেকে মুখ বের করে মনি বললো,
- আমিও কাম থেইকা ফিরা মায়ের কাছে খাওন চাইছিলাম। আমারেও গালি দিছে৷
- হো দিছে৷ তো? এখন না খাইয়া থাকবি?
- হো থাকমু। আমি কি তোর মতন বেশরম নাকি? গালি খাওনের পর অন্য খাওন আমার হজম হইবো না।
- ঐ শোন, আওনের সময় আমার লাইগা দুইটা রুটি আর বেশি কইরা মরিচ দিয়া ডিম আনবি৷ 

মায়ের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বৃষ্টি৷ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে দাঁত মুখ খিচিয়ে বললো,
- আসল বেশরম তুমি৷ খাওন খাইতে চাইছি দেইখা আমগো দুই বইনেরে তুমি গালি দিলা। এখন আবার নিজেই খাইতে চাইতাছো! 
- মায়ের খাওন নিয়া কথা শোনাস তুই! মায়ের খাওন নিয়া! জাহান্নামে যাবি তুই। 
- জাহান্নামেই আছি৷ স্বর্গে নাই আমি। 

ছোটভাই সুমনের হাত ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো বৃষ্টি। দুচোখ বেয়ে পানি ঝড়ছে তার। জীবনটা এমন কেন? এতটা কঠিন! একটু সরল হলে কি হতো! জীবনের শখগুলো, আহ্লাদগুলো একটু আধটু পূরন হলে কি হতো! ঐ যে সকালবেলা দেখতে পাওয়া সেই সুদর্শনটা, সেই সুদর্শনটা তার হলে কিইবা মন্দ হতো! 

চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বস্তির বাহিরের ফুটপাতে এসে দাঁড়ালো বৃষ্টি। কুপি জ্বালিয়ে এক মহিলা রুটি বানাচ্ছে৷ পাশেই নড়বড়ে একটা কাঠের বেঞ্চ রাখা। ফুটপাতের ওপাশে দুজন রিকশাচালক রিকশায় বসে রুটি খাচ্ছে। বেঞ্চটা ফাঁকা পড়ে আছে। রুটি বানানো মহিলাটিকে চারটা রুটি আর দুইটা ডিমভাজির ফরমায়েশ দিয়ে  দাঁড়িয়ে আছে বৃষ্টি। সুমন ডেকে বললো,
- আফা, আইয়ো বেঞ্চে বই৷ 
- হু।

বেঞ্চে বসে আনমনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে বৃষ্টি। মাঝেমধ্যে জীবনটা খুব বেশি তিক্ত লাগে৷ দুর্ভাগ্যকে মেনে নিতে কষ্ট হয়৷ মা বাবার আচরনগুলো মেনে নিতে কষ্ট হয়। পথে থাকা বিত্তবান মানুষগুলোর তার প্রতি করা কুকুর বিড়ালের মত আচরনগুলো মেনে নিতে কষ্ট হয়। কি হতো যদি বাবা জুয়া খেলা বাদ দিয়ে একটু সংসারী হতো! কি হতো যদি মা এতটা রুক্ষ না হয়ে কোমল হতো! কি হতো যদি বিত্তশালী লোকগুলো একটু সুন্দর ব্যবহার করতো! এসব ভাবতে ভাবতেই ডুকরে কান্না পেলো বৃষ্টির। 

- খালা, রুটি দেন তো৷ পেঁয়াজ মরিচ দিবেন বেশি করে। দুইটা ডিম একসাথে মিশাবেন৷ 

বৃষ্টির কানে পরিচিত কন্ঠ ভেসে আসলো পাশ থেকে। কোথায় শুনেছে এই কন্ঠ? ডানে তাকাতেই মুহূর্তেই মন থেকে কান্না ভাব সরে গিয়ে বিস্ময় জায়গা করে নিলো। কুপির আবছা আলোতে সুদর্শনকে দেখছে সে চোখের সামনে! এ কি কান্ড! রুটিওয়ালিকে রুটির ফরমায়েশ দিয়েই সুদর্শন এসে বসলো সুমনের পাশে৷ সুদর্শনের দিকে নিষ্পলক বোকার মত তাকিয়ে আছে বৃষ্টি। 

- এ্যাই, তুমি সেই সকালের মেয়েটা না? ফুল বিক্রি করেছিলে?
- আপনে আমারে চিনছেন?
- হ্যাঁ, সকালেই তো দেখলাম। চিনবো না কেন?

বিস্ময়গুলো যেনো আরো বেড়ে চলছে৷ খুশির অনুভূতি ধীরে ধীরে বাড়ছে। কষ্টগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। 

- আপনে এই জায়গায় রুটি খাইবেন?
- হ্যাঁ খাবো। কেন?
- রাস্তার জিনিস তাই জিগাই।
- তাতে কি? উনার হাতের ডিমভাজা খুবই মজার। তাই আসি।
- অসুখ হইলে?
- তোমাদের খেয়ে হজম হলে আমার কেন হবে না?
- আপনে আর আমরা তো এক না। 
- আমরা সবাই এক। সবাই এসেছি একজায়গা থেকে, যেতেও হবে ঐ একই জায়গায়।  এত ভেদাভেদ করে লাভ কি? তোমার ভাই প্লেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ ওর হাত থেকে প্লেট নিয়ে রুটি খাও। 

সুমনের হাত থেকে প্লেট নিয়ে রুটি খাচ্ছে বৃষ্টি। কিন্তু সম্পূর্ণ মনোযোগ পড়ে আছে সুদর্শনের দিকে। মানুষটা একটু পরপর হেসে হেসে টুকটাক কথা বলছে ওর সাথে। খুব সুন্দর করে হাসে সে৷ মন ভালো করার মত হাসি। বৃষ্টিরও মন ভালো হয়ে গেছে৷ বিষন্নতা আর নেই। আজ সকালেও বৃষ্টির মন খারাপ ছিলো। তাকে দেখে মনটা একদম ভালো হয়ে গিয়েছিলো। এখন আবার মন খারাপ হলো আর এই লোকটাকে দেখার পর মনটা আবার ভালো হয়ে গেলো। বৃষ্টি খুব ধীরে ধীরে নিজের খাবারটা খাচ্ছে। সে চাচ্ছে না খাবারটা শেষ হোক৷ সে চাচ্ছে না সুদর্শনের খাবারটাও শেষ হোক। শেষ হলেই তো উঠে চলে যাবে মানুষটা। বৃষ্টির ইচ্ছে হচ্ছে সুদর্শনকে বলতে,
- এত জলদি খান ক্যান? একটু আস্তে খান৷ আপনারে আরো কতটা সময় দেখি। 

কথাটা তাকে বলতে পারে না বৃষ্টি। সবাইকে কি আর সব কথা বলা যায়? সবার উপর কি আর অধিকার খাটিয়ে আবদার করা যায়? যায় না তো!

খাওয়া শেষে প্লেট রেখে উঠে দাঁড়ালো সুদর্শনটি। এগিয়ে গিয়ে দোকানিকে খাবারের টাকা পরিশোধ করে বৃষ্টিকে বললো,
- তোমার টাকা দিতে হবে না। আমি দিয়ে দিয়েছি। 
- আপনে দিতে গেলেন ক্যান?
- এমনি ইচ্ছে হলো।
- না, না এইডা খারাপ দেখায়। 
- একজন আরেকজনকে খাওয়াতেই পারে। এখানে খারাপের কি দেখলে? তুমি আমার কাছ থেকে জোর করে খেলে সেটা খারাপ হতো। আজ আসি তাহলে। ভালো থেকো।

চলে যাচ্ছে সুদর্শনটি৷ ধীরে ধীরে বাইক চালিয়ে যেতে থাকা এই মানুষটা দৃষ্টি সীমানার বাইরে চলে যাচ্ছে। তিক্ততা মাখা এই পৃথিবীর সবাই সমান হয় না৷ কেও কেও একদম ভিন্ন হয়৷ প্রখর রোদের দিনে এক পশলা বৃষ্টির মত৷ জীবন যখন খুব বিষিয়ে যায় তখন এই সুদর্শন মানুষটার মত লোকগুলো আমাদের জীবনে এক পশলা বৃষ্টির মত শান্তির কারন হয়ে যায়। বৃষ্টির আপাতত খুব শান্তি লাগছে। জীবনের তিক্ততাগুলো মনে পড়ছে না৷ তবে সূক্ষ্ম আফসোসও হচ্ছে। সেই পথে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললো, " হায়রে! তারে যদি ধইরা রাখতে পারতাম আজনম।"

( জানালা সংকলন ২০২০ " জানালার জোনাকিরা"-য় প্রকাশিত)

সমাপ্ত 

About the author

Amdad
I am a simple person, I love to learn new things. I try to take something from every experience in life.

Post a Comment