পরানের টান

Amdad
Amdad
গ্রাম থেকে আসা এক ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্রের ফোনের ওপারে থাকা অচেনা এক মেয়ের সাথে প্রেম, পরিবারের অমতে পালিয়ে বিয়ে এবং জীবনের সব বাধা পেরিয়ে পুনরায় পরিবারের কাছে ফেরার এক আবেগঘন গল্প।

শেরপুর শহরের এক্কেরে শেষ মাথায় যে ব্রহ্মপুত্র নদ, তার থেইক্যা একটু দূরেই আমগোর বাড়ি। আমি তখন ঢাকা শহরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি। মেলাদিন পর বাড়িত আইছি। মাটির ঘর, রোইদ উঠলে টিনের চাল ঝকঝক করে, আর বৃষ্টির দিনে যে টুপটুপ শব্দ—হেইডা শহরের ওই এসি রুমে বইসা কল্পনাও করা যায় না।

​সেদিন রাইতে আমি মোবাইলে ফেসবুক ঘাটতাছিলাম। হঠাত কইরা এক মেয়ের রিকোয়েস্ট আইলো। নাম তার 'নীলা'। প্রোফাইল পিকচার দেইখাই বুঝা যায়, মায়াবী এক্কেরে। আমি ভাবলাম, "আরে ভাই, এইরকম মায়াবী মেয়ে আমারে রিকোয়েস্ট দিল ক্যান?" রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করলাম।

​শুরু হইলো মেসেজিং। নীলা থাকে মেলা দূরে, চট্টগ্রাম শহরে। তার লগে কথা কইতে কইতে আমি পাগল হইয়া গেলাম। ফোনের ওপার থেইক্যা যখন সে হাসত, মনে হইত যেন শেরপুরের পাহাড় থেইক্যা ঝরনা নামতাছে। একদিন রাত্রে আমি তারে কইয়া ফেললাম:

​"ভালোবাসা তো কোনো নিয়ম মানে না রে নীলা। তুই চট্টগ্রামে থাকিস আর আমি শেরপুর, তাতে কী? আমার কলিজার মইধ্যে তো এক্কেরে তুই গাঁইথা গেছিস।"

​নীলা একটু সময় নিয়া কইল, "সজীব ভাই, আপনে মানুষটা খুব সহজ। আমি আপনারে অনেক আগেই ভালোবাইসা ফেলছি।"

​ব্যাস! শুরু হইলো আমগোর লুকায়া লুকায়া প্রেম। পড়াশোনা আর প্রেমের মাঝে দিনগুলো স্বপ্নের মতো কাটতাছিল। আমি ভাবছিলাম সব বুঝি এমনেই ভালো যাইব। কিন্তু সমস্যা শুরু হইলো যখন বাড়িত জানাইলাম।

​আমার বাজান হুনেই তো এক্কেরে কড়া মেজাজে কইল, "না! গ্রামের সাধারণ ঘরের পোলা হইয়া তুই শহরের মেয়েরে বিয়া কইরা আনবি? হেইডা হইতে পারে না। তারা আমগোর লগে মিলব না।" নীলার বাড়িতও একই অবস্থা। তারা কয়, "ইঞ্জিনিয়ার হইলে কী হইব, পোলা তো গ্রাম থেইক্যা আইছে।"

​দুই বাড়িত যখন অশান্তি চরমে, তখন আমি নীলারে কইলাম, "নীলা, দুনিয়া একদিকে আর আমরা একদিকে। তুই কি আমার লগে থাকবি?"

​নীলা ডুকরাইয়া কাইন্দা দিল। হেই কান্দা শুইনা আমার কলিজা ছিঁড়া যাচ্ছিল। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম—যা হওয়ার হইব, আমরা একসাথেই থাকমু। এক বিকেলে নীলা তার সব ছাইড়া দিয়া আমার কাছে চইলা আইল। আমরা কোর্টে গিয়া বিয়া কইরা ফেললাম।

​বিয়া তো করলাম, কিন্তু এরপরের পথটা যে এত পিচ্ছিল হইবো হেইডা ভাবি নাই। পকেটে টাকা নাই, থাকার জায়গা নাই। শহরের ছোট একটা ভাড়াবাড়িতে আমরা চইলা আসলাম।

বিয়া তো করলাম, কিন্তু এরপরের পথটা যে এত পিচ্ছিল হইবো হেইডা ভাবি নাই। পকেটে টাকা নাই, থাকার জায়গা নাই। শহরের ছোট একটা ভাড়াবাড়িতে আমরা চইলা আসলাম।

বিয়ার পর প্রথম কয়েক মাস আমরা খালি চোখের পানি ফেলছি। নীলা ছিল রাজপুত্তুরীর মতো, কিন্তু আমার লগে আইসা সে ডাইল-ভাত খাইয়া দিন কাটাইতে লাগল। আমি ছোট একটা চাকরিতে ঢুকলাম, ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ কইরা তখনো বড় কোনো সুযোগ পাই নাই।

​মাঝে মাঝে রাইতে দেখতাম নীলা জানলার কাছে বইসা কানত। আমি কাছে গিয়া কইতাম, "নীলা, আমার ওপর রাগ করছিস? আমার লগে আইসা তোর জীবনটা ত্যানাত্যানা হইয়া গেল।"

​নীলা আমার হাত ধইরা বলত:

​"পাগল হইছেন? এই দুনিয়াতে সব পাইয়াও শান্তি নাই যদি মানুষটা নিজের না হয়। আমি আপনার পাশে আছি, হেইডাই আমার বড় পাওয়া।"

​বাড়িতে বাজানরে ফোন দিতাম, বাজান ফোন কাইটা দিত। মা চুরি কইরা ফোন দিয়া কানত আর কইত, "বাজানরে, তোর বাপ তো জেদ ধইরা বইসা আছে। তগোরে মাফ করব না।"

​দিন যাইতে লাগল। এক বছর পর নীলার কোল আলো কইরা একটা চাঁদের মতো পোলা হইলো। পোলার মুখটা হইছে অবিকল আমার বাজানের মতো। এই খবর যখন গ্রামে পৌঁছাল, তখন বাজানের পাথরের মতো মনটা একটু নরম হইলো।

​নাতিরে দেখার জন্য বাজান আর থাকতে পারল না। একদিন দুপুরে হঠাৎ দেখি দরজায় কড়া নাড়তাছে। দরজা খুইলা দেখি বাজান আর মা দাঁড়াইয়া! বাজান পোলার দিকে তাকাইয়া কাইন্দা দিল।

​বাজান নীলার মাথায় হাত রাইখা কইল:

​"বউমা, আমারে মাফ কইরা দিও। আমি বুঝবার পারি নাই যে পরানের টান রক্তের টানের চেয়েও বড়।"

​সবাই যখন নাতিরে নিয়া হাসাহাসি করতাছিল, আমি নীলার চোখের দিকে তাকাইলাম। নীলার চোখে তখন আনন্দের পানি।

About The Author

You may like these posts

Post a Comment